‘পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস অপচয় ও চুরি বন্ধ হলে’ দেশের অর্ধেক সংকট কেটে যাবে
একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। বাংলাদেশ একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিশাল জনসংখ্যার চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য তিনটি উপাদান হলো পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস। কিন্তু‘ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অসচেতনতা, অব্যবস্থাপনা এবং একশ্রেণির মানুষের লোভের কারণে এই অমূল্য সম্পদগুলোর অপচয় ও চুরি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়ে থাকে, “পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, অপচয় ও চুরি বন্ধ করুন, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।” এই উক্তিটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কঠোর সরকারি পদক্ষেপ এবং জনগণের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে এই সংকটের ¯স্থায়ী সমাধান করতে এবং দেশকে এক টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
অপচয় ও চুরির বর্তমান চিত্র: আমাদের দেশে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় এবং অবৈধ ব্যবহারের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ-
পানির অপচয় ও অপব্যবহার: দাঁত ব্রাশ করার সময় বা দাড়ি কাটার সময় বেসিন ও কলের মুখ খুলে রাখা, পাইপ দিয়ে গাড়ি ধোয়া, এবং ত্রুটিপূর্ণ লাইনের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার পানি অপচয় হচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভ¯’ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।
বিদ্যুতের অপচয় ও সিস্টেম লস: দিনের আলোতে সরকারি-বেসরকারি অফিসে অপ্রয়োজনে বাতি ও পাখা জ্বালিয়ে রাখা, এসি অতিরিক্ত মাত্রায় চালিয়ে রাখা, এবং শপিংমলগুলোতে আলোকসজ্জার নামে প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয়। এর চেয়েও বড় অপরাধ হলো হুকিং বা অবৈধ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
গ্যাসের অপচয় ও অবৈধ সংযোগ: বাসা-বাড়িতে ম্যাচ বা লাইটারের খরচ বাঁচাতে সারাদিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা আমাদের দেশের একটি সাধারণ কিন্তু‘ মারাত্মক কুঅভ্যাস। এছাড়া শীতকালে কাপড় শুকানোর জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত অবৈধ গ্যাস সংযোগ, যার মাধ্যমে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি হচ্ছে।
অপচয় ও চুরির বহুমুখী কুফল: এই অপচয় ও চুরির খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো রাষ্ট্র এবং সাধারণ জনগণকে। অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, যা দেশের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যেত। অতিরিক্ত অপচয়ের ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার কারণে লোডশেডিং এবং লো-প্রেসার বা গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের শিল্প কারখানায়। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেকারত্ব বাড়ে। তাছাড়া, পানির অপচয়ের ফলে ভবিষ্যতে তীব্র খাবার পানির সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। পরিবেশগতভাবেও আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছি, কারণ অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকারের কঠোর আইন ও প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা: জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকারকে সর্বাগ্রে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। আইন কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কঠোর নজরদারি ও টাস্কফোর্স গঠন: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। চোর ও অবৈধ ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করছে বা অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। জরিমানা এবং দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান কার্যকর করতে হবে, যাতে অন্য কেউ এই অপরাধ করার সাহস না পায়।
প্রিপেইড মিটার ¯স্থাপন: শতভাগ বাসা-বাড়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রিপেইড গ্যাস এবং বিদ্যুৎ মিটার বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রিপেইড সিস্টেম চালু হলে মানুষ নিজ দায়িত্বে অপচয় কমিয়ে আনবে এবং চুরির সুযোগও বন্ধ হবে।
দুর্নীতি দমন: সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর (যেমন- তিতাস, ডেসকো, ওয়াসা ইত্যাদি) অভ্যন্তরে থাকা অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিহ্নিত করে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও আইনি শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। কারণ ভেতরের লোকজনের মদদ ছাড়া বড় ধরনের চুরি অসম্ভব।
জনগণের সচেতনতা সংকট সমাধানের মূল চাবিকাঠি: শুধুমাত্র সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল অপচয় ও চুরি রোধ করা সম্ভব নয়, যদি না দেশের সাধারণ জনগণ সচেতন হয়। প্রতিটি নাগরিককে বুঝতে হবে যে, এই সম্পদগুলো আমাদের নিজেদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
পারিবারিক শিক্ষা: পরিবার থেকেই অপচয় না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় লাইট-ফ্যান বন্ধ করা, পানির কল শক্ত করে আটকে রাখা এবং রান্নার কাজ শেষ হওয়ামাত্র চুলা বন্ধ করার মানসিকতা শিশুদের মধ্যে ইনজেক্ট করতে হবে।
সামাজিক প্রতিরোধ: পাড়া-মহল্লায় বা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে কেউ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের লাইন ব্যবহার করলে সমাজকে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। অবৈধ সংযোগের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: “আমি বিল দিচ্ছি, তাই যতটুকু ই”ছা ততটুকু ব্যবহার করব”— এই ক্ষতিকর মানসিকতা পরিহার করতে হবে। টাকা থাকলেই সম্পদ নষ্ট করার অধিকার কারও নেই, কারণ সম্পদটি সীমিত।
পানিই জীবন। নিরাপদ পানি ছাড়া মানবসভ্যতা কল্পনা করা যায় না। কৃষি কাজ থেকে শুরু করে গৃহপালিত ও শিল্প উৎপাদনে পানির কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে, আধুনিক সভ্যতার চাবিকাঠি হলো বিদ্যুৎ। আলো জ্বালানো, পাখা চালানো, কম্পিউটারের ব্যবহার থেকে শুরু করে বড় বড় কলকারখানা সচল রাখতে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। একইভাবে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। গৃহপালির রান্না, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি চালিত যানবাহন এবং সার কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই তিনটি সম্পদের যেকোনো একটির সংকট জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তাই এদের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির সাথে সরাসরি জড়িত।
আমরা যদি সত্যি দেশকে ভালোবাসি, তবে দেশের প্রতিটি ধূলিকণা এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে আমাদের ভালোবাসতে হবে। দেশপ্রেম কেবল মুখে স্লোগান দেওয়া বা জাতীয় দিবসে পতাকা ওড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশপ্রেমের আসল বহিঃপ্রকাশ ঘটে দেশের সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। প্রকৃতি আমাদের যে পানি, বাতাস ও খনিজ সম্পদ দিয়েছে, তা অসীম নয়। আমরা যদি আজ এগুলোর যত্ন না নিই, তবে আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা এক ভয়াবহ মরুভূমির মতো দেশে বাস করতে বাধ্য হবে। একটি পানির ফোঁটা বাঁচানো কিংবা একটি ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করাও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার শামিল। দেশকে ভালোবাসার অর্থ হলো দেশের ক্ষতি না করা, আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় বা চুরি করা দেশের বুক চিরে রক্তক্ষরণ করার সমান।
প্রযুক্তিগত সমাধান ও আধুনিকায়ন: অপচয় ও চুরি রোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে।
স্মার্ট গ্রিড ও রিমোট সেন্সিং: বিদ্যুতের লাইনে কোথায় চুরি বা লিক হচ্ছে, তা দূর থেকেই শনাক্ত করার জন্য স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভূগর্ভ¯’ পানির রিচার্জ: বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা মাটির নিচে পাঠিয়ে ভূগর্ভ¯’ পানির স্তর ঠিক রাখার প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে সৌরশক্তি এবং বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে মূল ধারার জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং অপচয়ের সুযোগও সীমিত হবে।
পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপচয় এবং চুরি রোধের বিষয়টি আর অবহেলার পর্যায়ে নেই, এটি এখন আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমরা যদি অপচয় ও চুরি বন্ধ করতে পারি, তবে বর্তমানের অর্ধেকেরও বেশি সংকটের সমাধান মুহূর্তেই সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের ইস্পাতকঠিন কঠোরতা এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি— আমরা দেশের সম্পদ অপচয় করব না, কাউকে চুরি করতে দেব না। প্রকৃতি থেকে পাওয়া এই অমূল্য উপহারগুলোর যত্ন নিয়ে আমরা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলব। তবেই আমাদের দেশপ্রেম সার্থক হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান: ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন, সিটিজি টাইমস ও চ্যানেল কর্ণফূলী।

মন্তব্য করুন: